বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি, প্রবাল পাথর, সারি সারি নারিকেল গাছ এবং শান্ত পরিবেশের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে দ্বীপটি আলাদা আকর্ষণ তৈরি করেছে। নারিকেল গাছের আধিক্যের কারণে সেন্ট মার্টিনকে অনেকেই ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামেও চেনেন।
তবে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের ক্ষেত্রে এখন শুধু জাহাজের টিকিট ও হোটেল বুকিং করলেই হবে না। সরকারের পরিবেশ সংরক্ষণমূলক নীতিমালা অনুযায়ী ভ্রমণের আগে ট্রাভেল পাস এবং নির্ধারিত নিয়মকানুন সম্পর্কে জানা জরুরি।
আপনি যদি জানতে চান সেন্ট মার্টিন যাওয়ার ট্রাভেল পাস কীভাবে পাবেন, ভ্রমণের জন্য কী কী নিয়ম মানতে হবে এবং যাওয়ার আগে কী প্রস্তুতি নেওয়া দরকার, তাহলে এই গাইডটি আপনার জন্য।
কীভাবে পেতে পারি সেন্টমার্টিন ভ্রমণের ট্রাভেল পাস?
সেন্ট মার্টিনে পর্যটকদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ এবং দ্বীপটির প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য ট্রাভেল পাস ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় ও নির্ধারিত সংখ্যক পর্যটক দ্বীপে প্রবেশের সুযোগ পান। ট্রাভেল পাস সাধারণত আপনার ভ্রমণের অনুমোদনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই সেন্ট মার্টিন যাওয়ার পরিকল্পনা করার সময় প্রথমেই ভ্রমণের তারিখ, যাতায়াতের মাধ্যম এবং টিকিটের বিষয়টি নিশ্চিত করা ভালো।
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের জন্য ট্রাভেল পাস পাওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অনুমোদিত পরিবহন ও টিকিট ব্যবস্থার মাধ্যমে ভ্রমণ করা। পূর্বে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নির্ধারিত জাহাজের টিকিট সংগ্রহের পর সংশ্লিষ্ট জাহাজ কর্তৃপক্ষ পর্যটকদের ট্রাভেল পাসের প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে থাকে। অর্থাৎ, অনেক ক্ষেত্রে আলাদাভাবে ট্রাভেল পাস সংগ্রহের ঝামেলা পর্যটককে করতে হয় না।
তবে নিয়ম ও প্রক্রিয়া সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, অনুমোদিত জাহাজ কোম্পানি অথবা সরকারি পর্যটনসংক্রান্ত প্ল্যাটফর্ম থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার নির্ধারিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস সংগ্রহ
২৮ নভেম্বর ২০২৪ এ সর্বশেষ পাওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড কেবল ‘কেয়ারি সিনবাদ’ জাহাজকে পর্যটক পরিবহণের অনুমতি দিয়েছে। আপনি জাহাজের টিকেট কাটলে, জাহাজ কর্তৃপক্ষই ট্রাভেল পাস সংক্রান্ত বাকি কাজ করে দিবে।
এছাড়াও আপনি ওয়েবসাইটে গিয়ে প্রথমে লগইন করতে পারেন। এরপর সেখানে প্রবেশ করে জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে ট্রাভেল পাস সংগ্রহ করতে পারেন।
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
সেন্ট মার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটকদের জন্য বেশ কিছু বিধিনিষেধ রয়েছে। ভ্রমণের আগে এগুলো সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।
১. পলিথিন ব্যবহার এড়িয়ে চলুন
দ্বীপের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার না করাই নিয়ম। প্রয়োজনীয় জিনিস বহনের ক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব ব্যাগ ব্যবহার করুন।
২. একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক এড়িয়ে চলুন
প্লাস্টিক বোতল, কাপ ও অন্যান্য single-use plastic দ্বীপের পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করুন।
৩. নির্ধারিত হোটেল বা থাকার জায়গার তথ্য প্রদান করুন
দ্বীপে রাতযাপন করলে আপনি যে হোটেল বা রিসোর্টে থাকবেন, সেই তথ্য প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো এবং বুকিং নিশ্চিত রাখা জরুরি।
৪. উচ্চ শব্দ ও শব্দদূষণ করবেন না
সেন্ট মার্টিনের শান্ত পরিবেশ নষ্ট করে এমন উচ্চ শব্দ, মাইক বা অন্যান্য শব্দদূষণমূলক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকুন।
৫. বারবিকিউ পার্টি এড়িয়ে চলুন
দ্বীপের পরিবেশ রক্ষার জন্য খোলা জায়গায় বারবিকিউ বা আগুন জ্বালানোর মতো কার্যক্রমে বিধিনিষেধ থাকতে পারে। ভ্রমণের আগে সর্বশেষ নিয়ম জেনে নিন।
৬. পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল থাকুন
প্রবাল, সামুদ্রিক প্রাণী, বালুচর, গাছপালা বা অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি হয় এমন কোনো কাজ করবেন না।
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণকে আরামদায়ক এবং স্মরণীয় করতে সঠিক প্রস্তুতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিগুলোর তালিকা দেওয়া হলো:
জাহাজের টিকিট নিশ্চিত করা: ভ্রমণের তারিখ নির্ধারণ করে আগেই জাহাজের টিকিট বুক করা।
থাকার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা: সেন্ট মার্টিনে থাকার জন্য হোটেল বা রিসোর্ট আগে থেকে বুকিং করে রাখা। বিশেষ করে ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে হোটেল বা রিসোর্ট পাওয়া কঠিন হয়। তাই আগে থেকে ব্যবস্থা নেওয়া।
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সঙ্গে নেওয়া: জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি সাথে রাখা। জাহাজের টিকিট, ট্রাভেল পাস ও হোটেল বুকিংয়ের কাগজপত্র হাতব্যাগে নিয়ে নেওয়া।
ব্যক্তিগত জিনিসপত্র নেওয়া
- হালকা ও আরামদায়ক পোশাক
- সানস্ক্রিন, সানগ্লাস, এবং ক্যাপ
- পানির বোতল, স্ন্যাকস, এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ
- ক্যামেরা বা মোবাইল ফোনের পাওয়ার ব্যাংক
- পর্যাপ্ত ক্যাশ টাকা, কারণ দ্বীপে এটিএম সুবিধা সীমিত
আবহাওয়ার খোঁজ খবর রাখা: যেহেতু নদী ও সমুদ্রপথের যাত্রা। তাই আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে যাত্রা শুরু করা।
সাবধানতা অবলম্বন করা: পর্যটকদের জন্য সেন্ট মার্টিন নিরাপদ, তবে স্থানীয় পর্যটন গাইডের পরামর্শ মেনে চলা। শিশু ও বয়স্করা সঙ্গে থাকলে অতিরিক্ত যত্ন নেওয়া।
সেন্ট মার্টিন যাওয়ার সময় যা দেখবেন
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণের পথে নানা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থাপনা ও স্থানীয় জীবনযাত্রা উপভোগ করতে পারবেন। পুরো যাত্রা অত্যন্ত মনোরম এবং পর্যটকদের জন্য রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হয়ে ওঠে।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত
সেন্ট মার্টিন পৌঁছানোর আগে বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। সমুদ্র সৈকতে সকালে হাঁটা, সূর্যাস্ত উপভোগ করা ও স্থানীয় খাবারের স্বাদ নিতে পারেন। আর সমুদ্রের পরিবেশে খাবার উপভোগ করতে চাইলে Sea Mount Beach Cafe তাজা সামুদ্রিক খাবার এবং সমুদ্রের দৃশ্যের সাথে একটি আরামদায়ক খাবারের অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারেন।
টেকনাফ ভ্রমণ (কক্সবাজার থেকে টেকনাফ)
কক্সবাজার থেকে টেকনাফ যাওয়ার পথে পাহাড়, নদী, ও সবুজ পরিবেশ নজর কাড়ে। পথে নাফ নদীর পাশ দিয়ে যেতে যেতে এক দিকে বাংলাদেশের এবং অন্য দিকের মিয়ানমারের দৃশ্য দেখতে পাবেন।
নাফ নদী
- টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন যাওয়ার পথে নাফ নদী পার হতে হয়।
- এই নদীর দুই পাশে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বন এবং শান্ত পরিবেশ।
- নদীতে মাছ ধরার নৌকাগুলো দেখতে অত্যন্ত চমৎকার লাগে।
জাহাজ যাত্রার অভিজ্ঞতা
টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত জাহাজে যাত্রা আপনার ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ। জাহাজ থেকে সাগরের গভীর নীল পানি এবং ডলফিনের খেলা (সৌভাগ্যবান হলে দেখতে পাবেন)।
দ্বীপের কাছাকাছি প্রবাল অঞ্চল
জাহাজ সেন্ট মার্টিনে পৌঁছানোর আগে প্রবাল সমৃদ্ধ জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন। নীলচে-সবুজ পানির নিচে প্রবাল এবং নানা ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী দেখতে পারেন।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রথম ঝলক
দ্বীপে পৌঁছানোর আগে দূর থেকে নারিকেল গাছের সারি এবং প্রবাল প্রাচীরের প্রাকৃতিক দৃশ্য আপনার মন কেড়ে নেবে। দ্বীপের সাদা বালির সৈকত ও ঝকঝকে নীল জলরাশির মিশ্রণ মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এনে দেবে।
আপনি কি সেন্ট মার্টিন যেতে চাচ্ছেন?
সি মাউন্ট বিচ অ্যান্ড ক্যাফে কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন পাটুয়ারটেক ও ইনানি বিচ এলাকায় অবস্থিত একটি পরিবেশবান্ধব ক্যাফে ও রেস্টুরেন্ট। সেন্ট মার্টিনের পাশপাশি কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত ভ্রমণের ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা নিতে এখনই আমাদের সাথে যোগাযোগ করুন।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নসমূহ
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের অ্যাপের কাজ চলমান। কাজ সম্পন্ন হলে যে কোনো অ্যান্ড্রোয়েড ফোন থেকে ট্রাভেল পাসের জন্য আবেদন করা যাবে।
জাহাজের টিকিট সংগ্রহ করলে জাহাজ কর্তৃপক্ষই আপনাকে ট্রাভেল পাস ব্যবস্থা করে দিবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় জাহাজ কর্তৃপক্ষকে এ দায়িত্ব দিয়েছে।
টেকনাফ থেকে সেন্ট মার্টিনে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওয়েবসাইট আছে। ওয়েবসাইটগুলোতে গিয়ে টিকিট সংগ্রহ করা যায়। এ ছাড়াও জাহাজগুলোর কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে এবং এন্ট্রি পয়েন্ট থেকে টিকিট সংগ্রহ করা যায়।
ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে গড়ে প্রতিদিন ২ হাজার করে পর্যটক সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ করতে পারবেন। সেখানে রাতযাপন করতে পারবেন। তবে সরকারের বিধি নিষেধগুলো মেনে চলতে হবে।

